দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে এক দশকের বেশি সময় ধরে স্থবির থাকা সংঘাতে আবারও জড়িয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ইয়েমেন। ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তা, পশ্চিমা কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তাদের মতে, ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবের স্থাপনা ও জাহাজ চলাচলে হামলার কারণে রিয়াদ এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর ধৈর্যের পরীক্ষা হচ্ছে। এতে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথি ও সরকারি বাহিনী লোহিত সাগর উপকূল থেকে সৌদি সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সম্মুখসারিতে সেনা সমাবেশ জোরদার করেছে।
জাতিসংঘ, ওমান এবং সম্প্রতি পাকিস্তারের মধ্যস্থতায় সংকট নিরসনের চেষ্টা চললেও এক পশ্চিমা কূটনীতিক জানান, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশা বাড়ছে।
২০২২ সালে হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর পর থেকে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত এড়াতে চেয়েছে সৌদি আরব। ওই যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে রিয়াদ।
তবে গত সপ্তাহে সৌদি বিমানবন্দরে হুথিদের হামলা এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিক, বিশ্লেষক ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা। হুথিরা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দায়ও স্বীকার করেছে।
হুথিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরে সৌদি হামলার জবাব হিসেবে সৌদি বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়েছে। আর নৌ অবরোধ সৌদি আরবের আরোপিত অবরোধের প্রতিক্রিয়া। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে রিয়াদ।
ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী গবেষক বারাআ শিবান বলেন, ‘২০২২ সালের পর থেকে সংঘাতের জন্য এত বড় প্রস্তুতি আমি আর দেখিনি।’
এ বিষয়ে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর, ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী এবং হুথি মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার হুথিদের যেকোনো হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হবে বলে সতর্ক করেন।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, সম্প্রতি তিনি ওমান ও সৌদি আরব সফর করে উত্তেজনা কমানো এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইয়েমেনকে উল্টো পথে নিয়ে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ইয়েমেনের মানুষ। আমরা এখনো পরিস্থিতি পরিবর্তন এবং ইয়েমেনিদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার দুই সপ্তাহ পর ইয়েমেনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ যুদ্ধের ফলে ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে হওয়া সম্পর্কোন্নয়ন কার্যত ভেঙে পড়েছে।
তাদের মতে, হুথি ও তাদের ইরানি মিত্ররা এখন সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টির সুযোগ দেখছে। সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলে হুথিদের নৌ অবরোধ লোহিত সাগর হয়ে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহনে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক বারাআ শিবান বলেন, এই উত্তেজনার মাধ্যমে হুথিরা সৌদি আরবের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও আর্থিক ছাড় আদায় এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে প্রভাব বাড়িয়ে কৌশলগত সুবিধা নিতে চাইছে।
এক জ্যেষ্ঠ হুথি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাব আল-মান্দাব প্রণালি সৌদি আরব ছাড়া অন্য দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য এখনো উন্মুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর ধরে হুথিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করলেও এখন সৌদি আরবে এ ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, হুথিদের সঙ্গে স্থায়ী শান্তি অর্জন সম্ভব নয়।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, ‘ক্রমেই এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, হুথিদের সঙ্গে শান্তি সম্ভব নয়। বরং যুদ্ধ বিলম্বিত হলে তার মূল্য আরও বেশি হতে পারে, বিশেষ করে সৌদি আরব যখন এক্সপো ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতের পথ পরিষ্কার করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর থেকে হুথিদের ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক নৌপথে ধারাবাহিক হামলা এবং জাতিসংঘের বহু কর্মীকে আটকের ঘটনায় আন্তর্জাতিক জনমতও তাদের বিরুদ্ধে গেছে। এতে সম্ভাব্য নতুন কোনো সামরিক অভিযানে সৌদি আরব আগের তুলনায় অনেক কম আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/